মো: ইসমাঈল হোসেন, রাজশাহী প্রতিনিধি
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দুর্গম চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নে স্থাপিত একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে—দেখতে দালান কোঠা সুন্দর, বোর্ড টাঙানো, ভিতরে কয়েকটি ফাইল ও কিছু পুরনো আসবাব। কিন্তু সেবা নেই। ওষুধ নেই। চিকিৎসক থাকেন না। এমনকি সাপে কামড়ালে অ্যান্টিভেনম নেই।
গ্রামের মানুষের অভিযোগ, সাধারণ জ্বর, ব্যথা কিংবা মাথা ঘোরার জন্যও রাজশাহীতে ছুটতে হয়। কেউ সাপে কাটা রোগী নিয়ে পৌঁছাতে না পারলে মাঝপথেই ঘটে প্রাণহানি। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে গর্ভবতী মা ও শিশু রোগীরা।
চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু
চর আষাড়িয়াদহের হেলাল উদ্দিন (৪৫) বলেন,
“আমার ভাগ্নিকে সাপে কাটে। রাজশাহী নেওয়ার পথে নৌকায়ই তার মৃত্যু হয়। কাছেই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থাকলেও ওরা বলল, কিছুই নেই।”
স্থানীয় মাদ্রাসা এর এক শিক্ষক বলেন,
“বাড়ি থেকে ৫০০ গজ দূরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কিন্তু সেখানে একটা স্যালাইনও মেলে না। এটা যেন শুধু দালান, কাজের কিছু না।”
গর্ভবতীদের জন্য মারাত্মক পরিস্থিতি
প্রতিবছর চরাঞ্চলের অন্তত ৩০-৪০ জন গর্ভবতী নারী শহরে নেওয়ার পথে নৌকায় বা মাঝপথেই গর্ভপাত কিংবা মৃত্যু বরণ করেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার । তিনি বলেন,
“নৌকায় নদী পার হতে হয়। সময় লাগে ১ থেকে দেড় ঘণ্টা। আর সামান্য অসুস্থ হলে রাজশাহী পৌঁছানোর আগেই সব শেষ।”
পরিসংখ্যানের চিত্র ভয়াবহ
চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের জনসংখ্যা: প্রায় ৭০,০০০
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ১টি (চলমান না)
নিয়মিত কর্মরত চিকিৎসক: ০
অ্যাম্বুলেন্স বা নৌ অ্যাম্বুলেন্স: নেই
প্রতি মাসে গড়ে ১৫–২০ জন রোগী চিকিৎসার অভাবে রাজশাহীর পথে মারা যায় (স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী)
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কি আছে?
একজন গ্রাম পুলিশ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“ভবন আছে, বোর্ড আছে, তালা খোলা থাকে মাঝে মাঝে। কিন্তু ভেতরে চিকিৎসা নেই। ওষুধ নেই। রাত হলে নিঃসন্ধান হয়ে যায়।”
স্থানীয় এক ইউপি সদস্য বলেন “এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একজন মহিলা চিকিৎসক একসময় আসতেন। এখন সেটাও বন্ধ। আমরা বারবার বলেছি, কেউ শোনে না।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, “চরাঞ্চলে চিকিৎসা পৌঁছানো আমাদেরও চ্যালেঞ্জ। চর আষাড়িয়াদহ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লোকবল এবং ওষুধ সরবরাহের বিষয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছি। অ্যান্টিভেনম ও জরুরি ওষুধ সংরক্ষণের চেষ্টা চলছে।”
মানবিক আবেদন চরবাসীর ভাষায়,
“আমরা কি মানুষ না? একটু সেবা চাই। একটু নিরাপত্তা চাই। মৃত্যুর জন্য রাজশাহী দৌড়াতে চাই না। আমাদের বাঁচার অধিকার কি নেই?”